রোগ-ব্যধি (তার নিজস্ব ক্ষমতায়) একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে লেগে যায় না।

 

রোগের মধ্যে ক্রিয়া করার নিজস্ব ক্ষমতা নেই। তাই আল্লাহ চাইলে রোগাক্রান্ত হবে নতুবা হবে না। এজন্যই দেখা যায়, সংস্পর্শে যাওয়ার পরও অনেকে রোগাক্রান্ত হয় না।

হাদীসে বলা হয়েছে রোগ-ব্যধি (তার নিজস্ব ক্ষমতায়) একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে লেগে যায় না। (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৫৭৪২)

মূলত ইসলামপূর্ব আরবের জাহেলি যুগে কিছু রোগ-ব্যাধিকে নিজস্ব ক্ষমতায় সংক্রামক মনে করা হত।

সেই প্রেক্ষিতে নবীজি সা. ইরশাদ করেছেন- عَدْوَى ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই।

এক বেদুইন জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তাহলে আমার উটের কী হলো, এগুলো সুস্থ অবস্থায় মাঠে চরছিল, এরপর খুজলিযুক্ত উট এসে এগুলোর মাঝে প্রবেশ করে, তারপর খুজলিযুক্ত উট সুস্থ উটগুলোকে খুজলিযুক্ত বানিয়ে দেয়?নবীজী বললেন, আচ্ছা, তাহলে প্রথম উটটি কীভাবে সংক্রমিত হলো?(অর্থাৎ প্রথম উট যেভাবে আল্লাহর হুকুমে খুজলিযুক্ত হয়েছে, বাকিগুলোও আল্লাহর ইচ্ছায়ই খুজলিযুক্ত হয়েছে)।

(সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ৫৭১৭)।

অর্থাৎ সেই অবস্থায় প্রথম উটটিকে যেমন আল্লাহ তাআলা কোনকিছুর সংক্রমণ ব্যতিরেকে নতুনভাবে রোগাক্রান্ত করেছেন, ঠিক তেমনি পরেরগুলোও আল্লাহ তাআলারই হুকুমে রোগাক্রান্ত হয়েছে। তা কারো সংক্রমণের কারণে হয়নি।

সুতরাং বুঝা গেলোকোন রোগের স্বয়ংক্রিয় সংক্রমণ দ্বারা কারো সেই রোগ হতে পারে না। যদি সে রকম কিছু দেখা যায়, তা আসলে মহান আল্লাহর হুকুমে সেই রোগ তার মধ্যে নতুনভাবে তৈরি হয়েছেযেমনভাবে মহান আল্লাহর হুকুমে সেই রোগ নতুনভাবে প্রথমজনের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এ বিষয়টিকে প্রত্যেক মুমিনের এরূপেই বিশ্বাস করতে হবে।

সেই যুগে লোকেরা বিশ্বাস করতো যে, রোগীর সংস্পর্শে এ রোগ তার নিজস্ব ক্রিয়াতে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। অথচ এরূপে কোন রোগ কারো মধ্যে সংক্রমণের ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা শিরক ও কুফরী বিশ্বাস। সেই কুফরী বিশ্বাসকে এ হাদীসে বাতিল করা হয়েছে। এ হাদীসের এরূপ ব্যাখ্যা করে আস-সুনানুল কাবীর কিতাবে ইমামুল হাদীস আল্লামা আবু বকর বাইহাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি উক্ত হাদীসের অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়ে বলেন

باب‏: لاَ عَدْوَى عَلَى الْوَجْهِ الَّذِى كَانُوا فِى الْجَاهِلِيَّةِ يَعْتَقِدُونَهُ مِنْ إِضَافَةِ الْفِعْلِ إِلَى غَيْرِ اللَّهِ تَعَالَى

এ বিষয়ের অধ্যায় যে, কোন রোগের সংক্রমণ বলতে কিছু নেইএ নাকচকরণ সেই সূরতের ভিত্তিতে যা জাহিলী যুগে মানুষ বিশ্বাস করতো তথা রোগ হওয়ার সম্বন্ধকে গাইরুল্লাহর দিকে করা। এ ভিত্তিতেই রোগের কোনরূপ সংক্রমণের ক্ষমতাকে নাকচ করা হয়েছে।

(দ্রষ্টব্য : আস-সুনানুল কাবীর, ১৫৮ পৃষ্ঠা)

হাদীস শরীফে রয়েছে

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخَذَ بِيَدِ مَجْذُومٍ فَأَدْخَلَهُ مَعَهُ فِي الْقَصْعَةِ ثُمَّ قَالَ كُلْ بِسْمِ اللَّهِ ثِقَةً بِاللَّهِ وَتَوَكُّلًا عَلَيْهِ

হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন কুষ্ঠরোগীর হাত ধরলেন, অতঃপর তার হাতকে তার সাথে (খাবার খাওয়ানোর জন্য) স্বীয় বরতনে প্রবিষ্ট করলেন। তারপর বললেন–“আল্লাহর নামে খাও। আল্লাহর উপরে অবিচল নির্ভরতা এবং তাঁর উপরে অনড় ভরসা।(জামিউত তিরমিযী, হাদীস নং ১৮১৭/ সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং ৩৯২৫)

তেমনিভাবে অপর হাদীসে এ ধরনের কুষ্ঠরোগীর নির্দ্বিধায় সুস্থ মানুষের সাথে ঘরে খাওয়া-থাকার বর্ণনা রয়েছে। সেই হাদীসটি হলো

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ لَنَا مَوْلَى مَجْذُومٌ فَكَانَ يَأْكُلُ فِي صِحَافِي وَيَشْرَبُ فِي أَقْدَاحِي وَيَنَامُ عَلَى فِرَاشِي

হযরত আয়িশা আলাইহাস সালাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন–“আমাদের একজন আযাদকৃত গোলাম ছিলো যে কুষ্ঠরোগী ছিলো। সে আমার বরতনে খাবার খেতো, আমার গ্লাসে পানি পান করতো এবং আমার বিছানায় ঘুমাতো।

(দ্রষ্টব্য : তুহফাতুল আহওয়াযী শারহু জামি তিরমিযী, ৫ম খণ্ড, ৪৩৮ পৃষ্ঠা)

অধিকন্তু মজবুত ঈমানের অধিকারী মুসলিমদের এভাবে সে ধরনের রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে মহান আল্লাহর প্রতি বিনয়াবনত হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে রয়েছে

عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ كُلْ مَعَ صَاحِبِ الْبَلَاءِ تَوَاضُعًا لِرَبِّك وَإِيمَانًا

হযরত আবু যর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেনরোগ-বালাইগ্রস্ত ব্যক্তির সাথে খাও তোমার প্রতিপালকের প্রতি বিনয়াবনত হয়ে এবং তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ ঈমান রূপে।(আল-জামিউস সগীর, হাদীস নং ৬৩৮৯)

(দ্রষ্টব্য : ফাইজুল ক্বাদীর শরহু জামিউস সগীর, ৫ম খণ্ড, ৪৩ পৃষ্ঠা)

বলা বাহুল্য, এরূপ ক্ষেত্রে বান্দার এটাই কর্তব্য যে, সেই রোগীর সংস্পর্শে এসে তার রোগ হওয়ার কারণে সে সেই রোগকে স্বয়ংক্রিয় সংক্রামক বলে বিশ্বাস করবে না। বরং সেই অবস্থায়ও তা মহান আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে বলে বিশ্বাস করবে এবং নিজের ঈমানকে অটল রাখবে।

মোট কথা, মহান আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো সেই রোগ হতে পারে না। সেই ভিত্তিতে প্রথম জনের যেভাবে মহান আল্লাহর হুকুমে সেই রোগ হয়েছে, তেমনি অন্যজনেরও আল্লাহর হুকুম হলে নতুনভাবে সেই রোগ হবে। আর আল্লাহর হুকুম না হলে কিছুতেই তার সেই রোগ হবে না। এ বিশ্বাসই সকল মুমিনের অন্তরে পোষণ করতে হবে।


শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট